শুক্রবার । ১লা মে, ২০২৬ । ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩

তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে ইটভাটায় শ্রমিকের লড়াই নিত্যদিনের

সুব্রত কুমার ফৌজদার, ডুমুরিয়া

ঝুঁকি ও অভাব-অনাটনের মধ্যদিয়ে দিন অতিবাহিত হয় ইটভাটা শ্রমিকদের। জীবনটা যেন তাদের ইটের মতোই পোড়া, তীব্র তাপদাহ, ধুলোবালি আর স্বল্প মজুরিতেই বেঁচে থাকার লড়াই! এভাবেই বছরে ৮ মাস ইটভাটায় বস্তি এলাকায় বসবাস যেন ঘরছাড়া শ্রমিকের।

জানা গেছে, প্রতিদিন আগুনের সাথে লড়াই করে এবং রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে ইটভাটার শ্রমিকরা। যেখানে সূর্য ওঠার অগেই জীবন শুরু, আর সূর্য ডুবলেও তাদের থামেনা হাড়ভাঙ্গা খাঠুনি! এটা খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সকল ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকের নিষ্ঠুর সংগ্রামের একটি চিত্র। উপজেলার ভদ্রা, কাজিবাছা, শ্রীহরি ও তেলিগাতি নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন সময় গড়ে ওঠা প্রায় ৩ ডজন ইটভাটার মধ্যে বর্তমান কার্যক্রম চলছে ২০টিতে। প্রতি ভাটায় কমপক্ষে ২০০ জন করে শ্রমিক রয়েছে। সবমিলে ৪ হাজারের বেশি ভাটাশ্রমিক কাজ করছেন এ উপজেলাতে। আশ্বিন মাস থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত বছরে ৮মাস চলে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ।

শুধু স্থানীয়রা নয়, এসব ভাটায় সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা থেকেও শ্রমিক আসে কাজ করতে। পেটের ক্ষুদা মেটাতে এসে শ্রমিকরা আগুনের চুল্লিতে শুধু ইট পোড়ায় না। তাদের নিজেদের স্বপ্ন আর ভবিষ্যতকেও পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। ভোর থেকে সন্ধ্যা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রাতেও কাজ করতে হয়। দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি সময়, এমনকি ১২ থেকে ১৪ ঘন্টাও কাজ করতে হয় কোন সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াই। যা তাদের জীবনকে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অনেক সময় তারা অসুস্থ হলেও দেখার জন্য পাশে থাকে না কেউ। অসহ্য গরমের মধ্যেও পেটের তাগিদে শ্রমিকদের রোদে পুড়ে ইট তৈরির কাজ করতে হয়। তাদের জন্য নেই কোন ভালো বিশ্রামাগার। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর রাতে গরমে ঘুমাতেও পারে না তারা।

প্রতি ইট ভাটায় বিভিন্ন সেক্টরে একজন করে কাজের সরদার থাকে। মূলত তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গা থেকে শ্রমিক আনা হয়। গুটুদিয়া ইউনিয়নের খড়িয়া এলাকার এসবি ব্রিকস ২শতাধিক শ্রমিক কাজ করছে বিভিন্ন সেক্টরে।

কথা হয় ভাটার লোড সাইডের সরদার আলাউদ্দিন বিশ্বাসের সাথে। তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ ভাটায় সরদারি করছেন। তার বাড়ি যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। তিনি বলেন, ‘তার আন্ডারে এসবি ভাটায় ১৫/১৬জন শ্রমিক কাজ করছেন। ১ হাজার কাঁচা ইট লোড দিলে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয় শ্রমিকদের। এভাবে কাজের উপর নির্ভর করে ৭’শ থেকে ১২’শ টাকা পর্যন্ত আয় করছে শ্রমিকরা।’ প্রতি ভাটায় ৪জন রাভিসম্যান থাকে। কয়লার বিষাক্ত ধুলার মধ্যে কাজ করতে হয় তাদের। এভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আগুনের তাপদাহের মধ্যে ইটভাটায় আনলোডের কাজ করে শ্রমিকরা। ভাটায় আগুন দেওয়ার ২০দিন পর থেকে আনলোড শুরু হয়। তখন ইটে ব্যাপক তাপ থাকে।তার মধ্যে কাজ করে থাকেন শ্রমিকরা।

আনলোড শ্রমিক মনিরুল শেখ জানান, ‘এক হাজার ইট আনলোড করলে ১৭০ টাকা দেয়।’ চেষ্টা করলে ২জন শ্রমিক দিনে ৮/১০ হাজার ইট আনলোড করতে পারে। এভাবেই চলে তাদের জীবন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খর্ণিয়া এলাকার ইট ভাটার এক শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, ‘ইটভাটা মালিকরা শ্রমিকদের অনেকটা দাসের মতো ব্যবহার করেন। মালিকরা দালালদের মাধ্যমে শ্রমিকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে কাজে নিয়ে আসেন। এই দাদনের টাকা শোধ না হওয়া অনেকটা বন্দি অবস্থার মধ্য দিয়ে ইটভাটায় শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। শ্রমিকদের কোনো সুরক্ষা নেই। দ্রব্যমূল্যের বাজারে প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম বৃদ্ধি হলেও শ্রমিকের কোনও বেতন বৃদ্ধি হয়না। শ্রমিকদের বেতনের একটি অংশ চলে যায় দালালদের কাছে (সরদার)।’

স্বল্প মজুরি ও বৈষম্য : কাজের তুলনায় শ্রমিকদের পারিশ্রমিক খুবই কম। ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনেক ইট ভাটায় দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় কাজ করছেন শ্রমিকরা, যেখানে জীবিকা নির্বাহ করা খুবই কঠিন। তবে ইট তৈরির নির্দিষ্ট কাজের ওপর ভিত্তি করে অনেকে দিনে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা আয় করছেন। অতিরিক্ত ধুলোবালি এবং গরমের কারণে শ্রমিকরা প্রায়শই শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু তাদের পাশে থাকে না কেউ। সরদাররা চিকিৎসার জন্য টাকা দেয়, কিন্তু পরে আবার বেতনের থেকে কেটে নেয়। শ্রমিকদের কাজ না থাকায় জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে কম বেতনেই এ ধরনের কাজ করতে বাধ্য হন। পরিবেশ রক্ষায় অনেক সময় ভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে চরম অনিশ্চয়তা পড়েন।

শিশুশ্রম : অনেক ক্ষেত্রে সপরিবারে কাজ করতে গিয়ে শিশুরাও এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এক কথায় ইটভাটার শ্রমিকদের দিন যাচ্ছে চরম অনিশ্চয়তা, শারীরিক কষ্ট এবং মজুরি বৈষম্যের মধ্য দিয়ে। এ যেন দেখার কেউ নেই।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন